সুপ্রিম কোর্টে ধাক্কা খেয়ে ট্রাম্পের নতুন ‘শুল্ক যুদ্ধ’: বিপাকে বাংলাদেশ ও ভারত
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 21 Feb, 2026
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে বড় ধরনের আইনি পরাজয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশ্ববাণিজ্যে নতুন অস্থিরতা তৈরি করলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
আগের আরোপিত ‘গ্লোবাল ট্যারিফ’ বা বৈশ্বিক শুল্ককে আদালত ‘অবৈধ’ ঘোষণার পর, ট্রাম্প শুক্রবার রাতে প্রায় সব দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নির্বাহী আদেশে সই করেছেন। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে নতুন করে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশ বাংলাদেশ ও ভারত।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে জানায়, প্রেসিডেন্ট ১৯৭৭ সালের আইন ব্যবহার করে ঢালাওভাবে শুল্ক আরোপ করতে পারেন না। ৬-৩ ভোটের এই রায়ে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে ন্যস্ত করা হয়।
এই রায়কে 'অপমানজনক' আখ্যা দিয়ে ট্রাম্প দ্রুত ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের সেকশন ১২২ ব্যবহার করে নতুন শুল্ক আরোপ করেন। এই আইন অনুযায়ী, দেশের বাণিজ্যঘাটতি মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট সাময়িকভাবে ১৫০ দিনের জন্য ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারেন।
কার্যকর: আগামী মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) থেকে। আওতা: মেক্সিকো ও কানাডার নির্দিষ্ট পণ্য বাদে প্রায় সব দেশ।
ব্যতিক্রম: ওষুধ শিল্প, অ্যারোস্পেস পণ্য এবং নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও কৃষিপণ্যকে আপাতত এই তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের ওপর প্রভাবের চিত্র
ট্রাম্পের এই 'সেকশন ১২২' শুল্ক নীতি দক্ষিণ এশিয়ার রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের ধস নামাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
১. বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে অশনি সংকেত: যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক বৃহত্তম বাজার। বর্তমানে বাংলাদেশ গড়ে ১৫ শতাংশের বেশি শুল্ক দিয়ে সেখানে পণ্য রপ্তানি করে। নতুন ১০ শতাংশ যোগ হলে মোট শুল্ক ২৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। এতে ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ার তুলনায় বাংলাদেশি পণ্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। বিজিএমইএ (BGMEA) নেতারা আশঙ্কা করছেন, এতে বড় বড় মার্কিন ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে অর্ডার কমিয়ে দিতে পারে।
২. ভারতের ইঞ্জিনিয়ারিং ও আইটি খাতে চাপ:** ভারতের রপ্তানি পণ্যের বড় অংশ—যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং সামগ্রী, গহনা এবং রত্ন পাথরের দাম যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে যাবে। তবে ভারতের জন্য একমাত্র স্বস্তির খবর হলো 'ওষুধ শিল্প' (Pharma) এই তালিকার বাইরে থাকা। ভারত যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রে জেনেরিক ওষুধের বড় সরবরাহকারী, তাই এই খাতটি আপাতত সুরক্ষিত।
বাংলাদেশ: বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার চেষ্টা চলছে। ব্যবসায়ীরা একে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখছেন।
ভারত: ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ইঙ্গিতও দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্ব প্রতিক্রিয়া: ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্রিটেনও এই পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছে। কানাডীয় চেম্বার অব কমার্স তাদের ব্যবসায়ীদের ‘কঠোর বাণিজ্যিক চাপের’ জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছে।
১৭,৫০০ কোটি ডলার ফেরতের আইনি লড়াই
আদালত আগের শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করায় এখন আমদানিকারকদের থেকে নেওয়া প্রায় ১৭,৫০০ কোটি (১৭৫ বিলিয়ন) ডলার ফেরত দেওয়ার প্রশ্ন উঠেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর একে ‘অবৈধ অর্থ ছিনতাই’ বললেও ট্রাম্প সাফ জানিয়েছেন, এই অর্থ ফেরত দেওয়া নিয়ে বছরের পর বছর মামলা চলবে।
"আগের শুল্ক বাতিল হওয়ায় যে ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল, নতুন শুল্ক আরোপের ফলে তা লাঘব হবে।"
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্প শুল্ককে মূলত একটি ‘আলোচনার হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করছেন। তিনি চাইছেন বাংলাদেশ বা ভারত যেন তাদের বাজার যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের জন্য আরও উন্মুক্ত করে দেয়। তবে এই সাময়িক শুল্ক ১৫০ দিন পর বহাল রাখতে হলে তাকে কংগ্রেসের মুখোমুখি হতে হবে, যা ট্রাম্পের জন্য এক বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

